একজন পরিশ্রমি আবু তাহের স্যারের গল্প-

dailybarta71dailybarta71
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  12:49 AM, 07 June 2020

সাখাওয়াত হোসেন আদনান
আজ যে শিক্ষকের গল্প বলবো তার হাত ধরে আমার পড়ালেখার হাতেখড়ি। নাম তার আবু তাহের স্যার। বাড়ি কৈয়ারবিল দ্বীপকুল পাড়ায়। কৈয়ারবিল সানরাইজ আইড়িয়াল স্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন আর বর্তমানে প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত আছেন।
সানরাইজ স্কুল ২০০৩ থেকে যাত্রা শুরু করে আর সেই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শিক্ষক হিসেবে এখনো লেগে আছেন স্যার।

আমি কৈয়ারবিল সানরাইজ আইড়িয়াল স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে থেকে আবু তাহের স্যারের বেশ সুনাম শুনতাম। তখন চকরিয়া তথা কৈয়ারবিল ইউনিয়নে সানরাইজ আইড়িয়াল স্কুলের বেশ সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলের রেজাল্ট ছিল অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেকগুণ ভাল।

আমাকে আব্বু ভর্তি করিয়ে দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই স্কুলের কেজি শ্রেণীতে। সেই সময়ে একটা রীতি ছিল, বিশেষ করে শিশুদের ভর্তি করানোর সময় মাথার উপর দিয়ে হাত অন্য পাশের কানের লতি ধরানো। যারা ধরতে পারতো তাদের ভর্তি করা হতো আর যারা পারতো না তাদের বাদ দিতো কিনা আমি জানতাম না। ঠিক সেইভাবে আমাকে ভর্তি করেছিলেন আবু তাহের স্যার। আমি ধরতে পেরেছিলাম।

স্কুলে ভর্তি হয়ে, স্কুল ড্রেস পড়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া শরু করি নিয়মিত। কেজি শ্রেণী থেকে স্যার আমাদের পড়াতেন। একেক সময় একেক বিষয় পড়াতেন খুনসুঁটি আর মজার মজার গল্পের ছলে। এভাবে কাটতে লাগলো আমার স্কুল জীবন। আবু তাহের স্যার এত মজার একজন স্যার ছিলেন পড়ানোর সময় শিক্ষার্থীরা স্যারের কাঁধে উঠে ছড়তেন আর গোল করে কুল জুড়ে বসতেন। স্যারও বেশ আদর, স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়ে একেক শিক্ষার্থীকে একেক নামে ডাকতেন। এখনো স্যার সেভাবেই প্রাক্তানদের দেখলে এমন করে তার দেওয়া নাম ধরে ডাকেন। তাই স্যারের সাথে শিক্ষার্থীদের সখ্যতা ছিল অনেক বেশি দৃঢ়।

স্যার আসলে অনেক পরিশ্রমি, উদ্যোমি একজন মানুষ। স্কুল এবং শিক্ষার্থীদের ঘিরে স্যারের পরিশ্রম ছিল যা সত্যি বলার মতো। যার এই কঠোর পরিশ্রমের কারণে পরীক্ষার ফলাফলে শতভাগ পাশ সহ সবার শীর্ষে থাকতেন আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । যার পরিশ্রমের কারণে শিক্ষার্থীরা সরকারি,বেসরকারি বৃত্তি লাভ করতো।

স্যার প্রতিটি শ্রেণীতে পাঠদান করতেন নিজস্ব শিখন দক্ষতা ও কৌশল প্রয়োগ করে। অন্য কোন শিক্ষক অসুস্থ কিংবা ছুটিতে থাকলে সেই স্যারের পাঠদানও আবু তাহের স্যার পূরণ করতেন। যতটুকু দেখতাম এতো পরিশ্রমের পরও স্যার কোন বিরক্ত হতেন না।বরং সব হাসি মুখে সব মেনে নিতেন। এখনি ঠিক তাই করে আসছেন।

স্কুল ক্যাম্পাস নিচু হওয়াতে বন্যা উঠতো সেই বন্যা উঠলে শ্রেণি কক্ষে পলি মাটি জমতো হাত দেড়’এক। অনেক অপরিষ্কার হয়ে যেতো স্কুল ঘর। বন্যা কমে গেলে যাতে দ্রুত ক্লাস আরম্ভ হয় তার জন্য স্যার নিজ হাতে স্কুল ঘর পরিষ্কার করতেন। এমনকি স্কুল ফাউন্ডের টাকা বাঁচানোর জন্য স্যার নিজ হাতে এসব পরিষ্কার করতেন। তার জলন্ত প্রমাণ আমি নিজেই। ঠিক সেই সব এখনো করে যাচ্ছেন।

আমরা ক্লাস ফাইভ পাশ করে বের হয়েছিলাম। আমরা পাশ করার পর কিছু সময় স্কুল ঠিকই আগের মতো ভাল চলছিল। পাশ করে আসার বেশ কিছুদিন পর থেকে যেসব স্যাররা আমাদের পড়াতেন তারা ভালো চাহিদার সুবাধে একেক জন একেক ভাবে অন্য কর্মে চলে যায়। শিক্ষকের অভাবে স্কুলও আগের মতো তেমন চলে না। আগের মতো শত শত শিক্ষার্থীদের কোলাহল এখন আর চোখে দেখার মত নেই। কিন্ডারগার্ডেন স্কুল যেহেতো শিক্ষার্থী কম হলে শিক্ষকদের বেতনও ঠিকমত হয়না। যারা গর্ভনিং বডির সদস্য তারাও ভলো মতে আয় করতে পারেনা বিধায় তারাও স্কুলের খোঁজ খবর রাখেনা। কিন্তু আবু তাহের স্যার ফেলে যাননি আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠ ।শত ঝড়ের মধ্যেও আকড়ে ধরে রেখেছিলেন স্কুলকে। তিনিও যদি চলে যেতেন তাহলে স্কুলের অস্থিত্ব আর থাকতো না।
অাবু তাহের স্যার এখন টিউশনি করে পরিবারের খরচের পাশাপাশি যতটুকু সম্ভব স্কুলের শিক্ষকদের বেতনও নিজ পকেট থেকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এখন এভাবেই চলছে।

স্যারের কাছ থেকে পড়াশুনা করে আমি আজ কুমিল্লায় ডিএমএফ ডিপ্লোমায় অধ্যায়রত আছি। মা বাবার পরে আমার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আবু তাহের স্যারের। স্যারের সহযোগিতার কারণে আজ আমি এতটুকুতে আসতে পেরেছি। আমার জীবনে যেসব সফলতা আছে তা স্যারের অবদান।
আমার জীবনে আবু তাহের স্যারের মতো একজন আদর্শবান, নিষ্টাবান, পরিশ্রমি শিক্ষক পেয়ে আমি সত্যিই গর্বিত।
যুগে যুগে আবু তাহের স্যারের মতো শিক্ষকের জন্ম হোক এই কামনা করি মহান আল্লাহ কাছে। জাতি গঠনে ছড়িয়ে পড়ুক এমন হাজারো শিক্ষক।
স্যারের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা আরও অনেক শিক্ষার্থী জব করছেন। অনেকে যোগ্যতা দেখিয়ে মেডিকেল, পলিটেকনিক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছেন।এই সব যোগ্যতার শিকড় গেড়ে দিয়েছেন আবু তাহের স্যার।যার জন্য আমরা আজ নিজেদের ধন্য মনে করি।স্যার আমাদের মাঝে বেঁচে থাকুক হাজার বছর।

লেখক:

সাখাওয়াত হোসেন আদনান,
কুমিল্লা মেডিকেল এসিসটেন্ট ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের ২য় বর্ষের ছাত্র।

আপনার মতামত লিখুন :