Main Menu

ভোলাহাটের মেয়ে ক্রিকেটার বাবলী

আলি হায়দার (রুমান)

ডানপিটা ছোট্ট্র মেয়ে বাবলী। বাবার অনুপ্রেরণায় ক্রিকেট ও ফুটবল খেলা শুরু। গ্রামের স্কুলপড়–য়া ছোট্ট মেয়ে বাবলীর সাহস বাড়িয়ে দেয় বাবা। ভীষণ ডানপিটে ছিলেন বাবলী। দুুপুরে বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকত তখন তিনি বেরিয়ে পড়তেন খেলার মাঠে। গ্রামে মেয়েদের কোন ফুটবল বা ক্রিকেট দল ছিল না। তাই বিকেলে ছেলেদের সাথে প্যান্ট সার্ট পরেই খেলতেন বাবলী। এখনো জিন্স প্যান্ট, শার্ট, টি-শার্ট পরেন তিনি। কখনো মেয়েদের পোশাক পরেনা করেনা। তাই গ্রামের খেলার সাথীরা তাকে ভাই বলে ডাকে। ক্লাসমেট, গ্রামের খেলার সাথীরা সবাই তার ভাই ও বন্ধু। পরিবার থেকে পুরো সহযোগিতাই পেয়েছেন। পরিবারের সবার সহযোগিতার জন্যই আজ গ্রাম অঞ্চলে জন্ম নিয়ে মহিলা প্রমিলা ক্রিকেট ক্লাবে খেলছেন বাবলী।

কথায় আছে, “একজনের কাজ, আরেকজনের উপহাস”। গ্রামীণ পরিবেশে নারী পুরুষের মধ্যে বড় ধরণের পার্থক্য দেখা যায়। প্রথমতঃ সেখানে পারিবারিক ভাবে মেয়েদের স্বাধীনভাবে চলাফেরায় বড় ধরণের বাধা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে কাজের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট পার্থক্য । ছেলেদের ক্ষেত্রে আশা করা হয় যে তারা বাড়ির বাইরের সব কাজ করবে আর মেয়েরা ব্যস্ত থাকবে ঘরের ভেতরের কাজকর্ম নিয়ে। যদি একটি মেয়ে বিভিন্ন ধরণের খেলা যেমন, সাঁতার, ক্রিকেট বা ফুটবলে অংশগ্রহণ করতে চাই, তখনই তাদের লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হতে হয়। কেউ সহযোগিতা তো দূরে থাক উল্টো তাদের উপহাস করতে থাকে।

তাহলে কীভাবে এলেন ক্রিকেটে বাবলী? উত্তরটা শোনা যাক বাবলির মুখেই, ‘আমার কানারহাট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শুরু। তখন থেকেই খেলাধুলা করতাম। ২০১১ সালে কানারহাট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ফুটবল খেলা তার সাথে ক্রিকেট খেলাটাও চলতো পাড়ার ছেলেদের সাথে। যেহেতু মেয়েরা ফুটবল, ক্রিকেট দল করে খেলতেন না তাই আমি ছেলেদের সাথেই খেলতাম। ২০১১ সালে প্রথম বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট ইউনিয়ন পর্যায়ে অংশগ্রহণ করে রার্নাস আপ, আর স্কুল পর্যায়ে হয়েছিলাম চ্যাম্পিয়ন। ২০১২ সালে হাইস্কুলে খেলার সুযোগ তেমন ছিলনা। তার পরেও গ্রামের বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলতাম। বাবার সাথে খেলতাম। বাবাও খেলা ভালবাসতো। বল করতেন আমাকে শিখিয়ে দিতেন কি রকম বল আসলে কিভাবে মারতে হবে। আমার বাবা খেলার জন্য আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। মা তেমন কিছু বলতো না তবে দুপুরবেলা না ঘুমিয়ে খেলতে চলে যাওয়ায় জন্য বকা দিতেন। ২০১২ সালে (ইকঝচ) চলে গেলাম। ট্রায়াল দিলাম কিন্ত সুযোগ পেলামনা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০১৩ সালে আবার (ইকঝচ) ট্রায়াল দেওয়ার পরে টিকে গেলাম। কিন্তু চিরকুটে নাম আসলো না।

এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করতে হবে বলে প্রাকটিস ২ বছর বন্ধ করতে হয়। কিন্তু একদমই খেলা বন্ধ করতে করিনি। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বাড়িতে ক্রিকেট খেলা দেখতাম। আঙ্গিনায় খেলতাম। লেখাপড়ার পাশাপাশি এইভাবে চলতে থাকে খেলা। ২০১৭ সালে বজরেটেক সবজা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অ+ পেয়ে এসএসসি পাশ করি। উচ্চশিক্ষার জন্য রাজশাহী চলে যায়। লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেট কোচ মিজানুর রহমান মিলন ভায়ের কাছ থেকে আরো ভালো ভাবে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিতে লাগলাম। ২০১৮ সালে (১ম বিভাগ মহিলালীগ) ঢাকা প্রমিলা ক্রিকেট ক্লাবে চান্স পেয়ে গেলাম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলা প্রত্যন্ত অঞ্চল বজরাটেক শাহপাড়া গ্রামে ২০০১ সালের ১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন প্রমিলা ক্রিকেটার বাবলী। গ্রামে সায়নি নামে পরিচিত। বাবা ভোলাহাট সাইফুন্নেসা ক্লিনিকে চাকরিজীবি বজলুর রহমান শাহ্ ও মা গৃহিণী দিলারা আফরোজ এর তিন সন্তানের মধ্যে বাবলী মেজ। মেজ মেয়ে বাবলী এখন বাংলাদেশ প্রমিলা নারী ক্রিকেটার। তিনি ডানহাতি অপেনার ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলে থাকেন ফিল্ডিং করে বাউন্ডারিতে। এখন তিনি বাংলাদেশ প্রমিলা ক্রিকেট ক্লাব থেকে খেলছেন। তিনি কুস্তিতেও পারদর্শী।

রাজশাহী বিভাগীয় (স্থানীয়) কুস্তি প্রতিযোগীতা ২০১৮-২০১৯ পেয়েছেন স্বর্ণ পদক। বজলুর রহমান শাহ্ ও মা গৃহিণী দিলারা আফরোজ বলেন, যতই ঝড় আসুক তার মেয়ে বাবলীকে জাতীয় মানের ক্রিকেটার হতে যা করা লাগবে তাদেও সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে। তারা বলেন, বাবলী একদিন জাতীয় ক্রিটার হয়ে ভোলাহাট ও জাতির মুখ উজ্জ্বল করবে এমন প্রত্যাশা করেন বলে জানান।

বর্তমানে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ৫ম সেমিস্টারে পড়ছেন। ক্রিকেট খেলা ছাড়া একটা দিনও ভাবতে পারেন না তিনি। বাবলী বলেন, পাকিস্থানের শহিদ আফ্রিদি, ভারতের শচিন টেন্ডুলকার ও মহিলা ক্রিকেটার মানদানার খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হন। ছোট থেকে ক্রিকেট ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখেছি। বাংলাদেশের জাতীয় দলের একজন তারকা ক্রিকেটার হতে চাই। যত দিন পারি খেলে যেতে চাই। দেশের জন্য খেলতে পারাটা আসলেই অনেক সম্মানের।

ভোলাহাট পল্লী বিদ্যুৎ সাব-জোনাল অফিসের এজিএম রুহুল আমিন বলেন, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। তবে এই ক্ষমতায়ন সর্বস্তরে নিশ্চিত হয়নি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি এখনও অনেক কম। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন বাংলাদেশের নারীরা অবদান রাখছেন ঠিক তেমনি ক্রীড়াক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের অংশগ্রহণ আগের যেকোন সময়ের থেকে অনেক উজ্জ্বল। ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের উজ্জ্বল উদাহরণ প্রমিলা ক্রিকেটার বাবলী। বাবলী ও বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট অনুর্ব্ধ-১৭ দলের অধিনায়ক ভোলাহাটের নাঈমকে অভিনন্দন ও শুভ কামনা জানিয়েছে ভোলাহাট সংবাদ পরিবার, ভোলাহাট পল্লী বিদ্যুৎ সাব-জোনাল অফিসের পরিবারের পক্ষে এজিএম রুহুল আমিন, ভোলাহাটবাসি।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*